আসুন আপনারা- সবাই আসুন ডাকতে ডাকতে প্রতিরোধে গিয়ে শহীদ হন গোবিন্দগঞ্জের মান্নান

মোস্তফা কামাল সুমন: মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে ট্রাকের ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে ট্রাক ভর্তি কর্মী বাহিনী নিয়ে “আসুন আপনারা- সবাই আসুন” ডাকতে ডাকতে প্রতিরোধে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন এক তরুণ। এই তরুণই গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের কৃতিসন্তান বীর শহীদ আব্দুল মান্নান আকন্দ। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কাটাখালিতে ব্রীজ ভাঙতে গিয়ে শহীদ হন তিনি। নিজের বুকের তাজা রক্তে সিক্ত করেন প্রিয় সোনার বাংলাকে।

বীর শহীদ আব্দুল মান্নান আকন্দ ১৯৫১ সালের ৩১ ডিসেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মাগুরা কেশবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কৃষক ওসমান আলী আকন্দের পুত্র আব্দুল মান্নান আকন্দ ছিলেন খুব মেধাবী ছাত্র। ১৯৬৬ সালে গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৮ গোবিন্দগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হন। তিনি ছিলেন একজন কৃতি ফুটবলার। তাঁর নেতৃত্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হল আন্তঃ হল প্রতিযোগিতায় কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়। শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয় সমগ্র গোবিন্দগঞ্জ থানা ব্যাপী ফুটবলার হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলের ক্রীড়া সম্পাদক (১৯৬৯-১৯৭০)।

বীর শহীদ আব্দুল মান্নান আকন্দ ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তান বাহিনীর গতিরোধ করার জন্য কাটাখালি ব্রীজ ভাঙতে গিয়ে শহীদ হন। সেদিন আসলে কী ঘটেছিল জানার চেষ্টা করার সময় হাতে আসে দুইটি মহামূল্যবান পুস্তিকা। ১৯৮৩ সালে আব্দুর রউফ আকন্দ সম্পাদিক এক সময়ের সাড়া জাগানো গোবিন্দগঞ্জের সংগঠন শহীদ স্মৃতি সংঘ ও পাঠাগারের স্বাধীনতা দিবস স্মরণীকা “উদয়ের পথে”। সেই স্মরণীকায় মুহঃ জোবাইদুর রহমানের লেখা “ মুক্তিযুদ্ধের একদিন: ২৭ মার্চ ১৯৭১ এর গোবিন্দগঞ্জ” সুন্দর ভাবে ফুটে উঠে সেই দিনের চিত্র। এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সূবর্ণ জয়ন্তীতে আব্দুল মান্নান আকন্দের উপর লেখা থেকে গোবিখবর’র পাঠকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবো কিভাবে আব্দুল মান্নান আকন্দ শহীদ হলেন।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকেই সারাদেশ উত্তাল। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ সারা দেশে গণজোয়ারের সৃষ্টি করে। দেশের ছাত্র শ্রমিক কৃষক রাজনীতিবিদ সকলে মিলে সম্মিলিত ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য চলতে থাকে প্রচেষ্টা। এই উত্তালের ঢেউ লাগে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জেও। ৭ মার্চের ভাষণের পর থানা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। গোবিন্দগঞ্জে ২০ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত চলতে থাকে সপক্ষীয় রাজনৈতিক সামাজিক শ্রমজীবী ও ছাত্র সংগঠনের সাথে আলোচনা। সিদ্ধান্ত হয় কাটাখালি ব্রীজে পাকিস্তানীদের প্রতিরোধ সৃষ্টি করার। ২৬ মার্চ রাতে বা ২৭ মার্চ সকালে গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালি ব্রীজে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়।

২৭ মার্চ ভোর থেকেই গোবিন্দগঞ্জে মানুষের ঢল নামে। সবাই ছুটছে থাকে কাটাখালি ব্রীজে প্রতিরোধ সৃষ্টিতে। এসময় একজন সুদর্শন যুবক সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করে। এই যুবক কর্মী ভর্তি ট্রাকের ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে জনতাকে উদ্ধুদ্ধ করছিলেন। পাশে ছিল বাবলু মহন্ত। ট্রাক ভর্তি কর্মীদের নিয়ে ছুটছে কাটাখালি ব্রীজের দিকে। এবং মৃদু চলন্ত ট্রাক থেকে হাঁক দিচ্ছে “ আসুন আপনারা- সবাই আসুন”। এই সুদর্শন যুবক দেশমাতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর শহীদ আব্দুল মান্নান আকন্দ।

১৯৭১ সালে ২৭ মার্চ ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হাজারো ছাত্র জনতা রাজনৈতিক কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে কাটাখালি ব্রীজের উত্তর অংশের রাস্তা কেটে খাদ করে দেয়। কিন্তু বেলা ৩টার দিকে উত্তর দিক থেকে আসে পাকিস্তান বাহিনীর একটি দল। তারা কাটাখালি ব্রীজে এসেই এলোপাথারি গুলি করতে থাকে। হাজার হাজার জনতা দিকবিদিগ ছুটতে থাকে। আব্দুল মান্নান ব্রীজের দক্ষিণ পূর্ব দিকে ফুলবাড়ীর দিকে ছুটতে থাকে। এসময় পাকিস্তান বাহিনী তাদের পিছু ধাওয়া করে। ফাঁকা মাঠে তারা মান্নান কে ব্রাশ ফায়ার করে। এসময় আরো অনেককেই ব্রাশ ফায়ার করে পাকিস্তান বাহিনী। এতে শহীদ হয় মান্নান, বাবলু, কিশোর মজিদ সহ আরো অনেকে। আর এইভাবে দেশমাতৃকার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন বীর শহীদ আব্দুল মান্নান আকন্দ আমাদের উপহার দেন স্বাধীন বাংলাদেশ।

দুঃখ প্রকাশ (প্রথম পোস্টে প্রচ্ছদে অসাবধানতাবশত শহীদ মান্নানের ছবির বদলে শহীদ হারেজ আকন্দের ছবি ছিল)।

Comments

comments