সর্বশেষ সংবাদ

হাইড্রোজ মিশিয়ে তৈরি আখের গুড় মানবদেহের ক্ষতি সহ অতিরিক্ত লোকসানের মুখে রংপুর চিনিকল

মনজুর হাবীব মনজু, মহিমাগঞ্জ (গাইবান্ধা) থেকে : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে ও মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ‘হাইড্রোজ’ মিশিয়ে গুড় উৎপাদন করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এসব গুড় বিভিন্ন মিষ্টিজাতীয় খাদ্যে ব্যবহারের ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। এতে ছোট ছোট শিশুসহ সাধারণ ভোক্তারা ক্যান্সারসহ বিভিন্ন দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি আইন অমান্য করে চিনিকলে আখ সরবরাহ না করায় প্রতি বছরই প্রয়োজনীয় আখের অভাবে সরকারি চিনিকলগুলোকেও পড়তে হচ্ছে লোকসানের মুখে। এর সাথে জড়িত আখচাষী, গুড় উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের আইন অমান্য করার প্রবণতার পাশাপাশি নাগরিক দায়িত্ববোধের অভাবের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সমাজের সচেতন মানুষেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাইবান্ধা জেলার একমাত্র ভারিশিল্প কারখানা উপজেলার মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর চিনিকলসহ দেশের ১৫টি চিনিকলের মিলস্ জোন এলাকায় যন্ত্রচালিত মাড়াই কল দিয়ে আখ মাড়াই করে গুড় উৎপাদন নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক এ সংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তি প্রচার করে আসছেন নিয়মিত। কিন্তু প্রতি বছরই চিনিকলগুলোতে সরবরাহের জন্য উৎপাদিত আখের একটি বড় অংশ অবৈধ পন্থায় গুড় মাড়াই কলে আগাম বেচে দেয়া হয়। এ কারণে চিনিকলগুলোর মাধ্যমে আখ চাষের জন্য সরকারের দেয়া ঋণ যেমন শোধ হয় না, তেমনি প্রচুর জনবল খাটিয়ে, দফায়-দফায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ঋণসহায়তা দিয়ে উৎপাদিত আখ চিনিকলে সরবরাহ না পেয়ে চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয় না তাদের।

চলতি বছর আখ উৎপাদন মৌসুমে কেবলমাত্র রংপুর চিনিকলের আটটি সাব-জোনের মধ্যে পাঁচটি সাব-জোনেই প্রায় অর্ধশত যন্ত্রচালিত আখমাড়াই কল চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব মাড়াই কলে প্রতিদিন প্রায় দেড়শ’ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করা হচ্ছে। গত এক মাস ধরে এভাবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করা হয়েছে। চলতি বছর চিনিকল কর্তৃপক্ষের দেয়া বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরী ও সেচ বাবদ নগদ অর্থ ঋণ এবং পরামর্শ সহায়তা দিয়ে মিল্স জোন এলাকায় উৎপাদিত হয়েছে ৫৫ হাজার মেট্রিক টন আখ। সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক এ আখের সবটুকুই রংপুর চিনিকলে সরবরাহের কথা থাকলেও চলতি মৌসুমে পাঁচটি সাবজোনের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে ৫৮টি যন্ত্রচালিত মাড়াই কল চালু করে গুড় তৈরি শুরু হয়। তবে সম্প্রতি এসব মাড়াইকল বন্ধে প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু কল বন্ধ হলেও এখনও চলছে ৪৪টি আখ মাড়াই কল। গত প্রায় একমাস ধরে নলডাঙ্গা সাব-জোনে ১২টি, পীরগঞ্জ সাব-জোনে ২০টি গোবিন্দগঞ্জ সাব-জোনে ৫টি, সাহেবগঞ্জ সাব-জোনে ৫টি ও মোকামতলা সাব-জোনে ২টি মোট ৪৪টি আখ মাড়াইকলে প্রতিদিন প্রায় একশ’ ৩২ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে গুড় উৎপাদন করা হচ্ছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি মাড়াইকলে আখের রসে গুড় সাদা করার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক ‘হাইড্রোজ’।

গাইবান্ধার সিভিল সার্জন এবিএম আবু হানিফ এ বিষয়ে জানিয়েছেন, মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজ মানবদেহে ক্যান্সারসহ নানা প্রকার জীবনঘাতি রোগের সৃষ্টি করতে পারে। শিশুদের জন্য এ উপাদানটি একেবারেই বিষ হিসেবে বিবেচনা করে তা পরিহার করা উচিৎ।

রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: রফিকুল ইসলাম করতোয়াকে বলেন, গত এক মাসে অবৈধ পাওয়ার ক্রাশার ব্যবহার করে এ চিনিকলের ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত আখের একটি বড় অংশ মাড়াই করে অস্বাস্থ্যকর গুড় তৈরি করা হয়েছে। এতে জাতীয় ক্ষতির পাশাপাশি মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হাইড্রোজ ব্যবহার করে তৈরি গুড় বাজারজাত করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে অবৈধ যন্ত্রচালিত আখ মাড়াইকলের সাথে নিষিদ্ধ হাইড্রোজ পাউডারও জব্দ করেছেন। অভিযানকালে জড়িতরা পালিয়ে গেলে কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। চিনিকল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে মামলা করেছে।

Comments

comments