সর্বশেষ সংবাদ

৮ ডিসেম্বর পলাশবাড়ী হানাদার মুক্ত দিবস

আরিফ উদ্দিন, স্টাফ রিপোর্টার, গাইবান্ধা থেকে: ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১। স্থানীয়ভাবে এদিন পাক মুক্ত হয়েছিল পলাশবাড়ী এলাকা। একাত্তরের এইদিন ঘাতক পাক হানাদার বাহিনীসহ এদেশীয় দোসররা সেদিন পালিয়ে যায়। মিত্রবাহিনীসহ যুদ্ধে অংশ নেয়া স্থানীয় যোদ্ধারা শত্রু মুক্ত করে লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়। স্থানীয় ভাবে দিনটি বড়ই বেদনা বিঁধুর। হানাদার বাহিনী পতনের পর এলাকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে কাঙ্খিত মুক্তির উল্লাস। আনন্দে উদ্বেলিত কন্ঠে সেদিন বিজয় উৎসব কাফেলার ‘জয় বাংলা’-‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল পলাশবাড়ীর আকাশ-বাতাস। সম্মুখ যুদ্ধে সেদিন অনেকেই শহীদ হয়েছেন। দেশমাতৃকার টানে যুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। যারা যুদ্ধ শেষে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছিলেন সেইসব বীর যোদ্ধাদের মধ্যে আজ অনেকেই বেঁচে নেই। দিনের পর মাস-মাসের পর দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেছে।

পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে কত নারী-পুরুষ ও শিশু অকাঁতরে নিহত হয়েছেন। কত মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হয়েছে। অজানা অনেকেই হয়েছেন বীরঙ্গনা। এসবে প্রকৃত সঠিক তথ্য আদৌ কেউ জানেন না। হানাদার বাহিনীর কসাইরা মুখে কথা বলতো বায়োনেট দিয়ে এবং হা-হা করে হাসতো মানুষের তাজা বুকে মেশিনগানের ব্রাঁশফায়ারে গুলি চালিয়ে। উল্লাস করতো তাজা রক্ত ঝড়িয়ে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা পরবর্তি এলাকার নির্দিষ্ট সংখ্যক কয়েকটি স্থান ছাড়া অসংখ্য গণকবর ও বধ্যভূমি এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন। কালের বিবর্তনে অরক্ষিত ওইসব গণকবর ও বধ্যভূমি সমূহের নাম নিশানা পর্যন্ত গেছে মুছে। কতিপয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যূ চক্রের কালো থাবায় সেখানে চাষবাস করা হচ্ছে। কোথাও জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে। গড়ে উঠেছে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দালান-বাড়ি।

ক্রমান্বয়ে গণকবরগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। পলাশবাড়ী শহরে অবস্থিত সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের বিভাগীয় কার্যালয় অভ্যন্তরে ছিল পাক হানাদারদের ক্যাম্পে। এলাকা ছাড়াও অজ্ঞাত বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য স্বাধীনতাকামী নারী-পুরুষদের ধরে এই ক্যাস্পে নিয়ে আসা হত। হানাদার বাহিনী তাদের লাাঞ্চিত-অত্যাচার-নিপীড়ন ছাড়াও নির্মম ভাবে হত্যাযজ্ঞ চালাত। ওই স্থানটিতে অজ্ঞাত সংখ্যক নিহতের গণকবর রয়েছে বলে জানা যায়।
পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেখানে বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে একটি নাম ফলক নির্মাণ করা হয়। উপজেলার প্রত্যন্ত পল্লী কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত কাশিয়াবাড়ীর পশ্চিম রামচন্দ্রপুরে পাক হানাদার বাহিনী স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার-আলবদর-আলসামসসহ দোসরদের সহযোগিতায় ঝটিকা অভিযান চালায়।সেদিন এলাকার বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশুদের ধরে নিয়ে এনে সারিবদ্ধ করে প্রকাশ্য দিন-দুপুরে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়।

উপজেলা প্রশাসন এখানেও একটি নাম ফলক নির্মাণ করেন। শুধুমাত্র মহান স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের বিশেষ দিনে ওইস্থানে শায়িত বীর শহীদদের আনুষ্ঠানিক ভাবে স্মরণ করে থাকেন। গোটা বছর জুড়ে বধ্যভূমি গুলো থাকে চরম অবহেলিত। এগুলো সবই এখন গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ স্থানীয় পিয়ারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে পাকিস্তানী হানাদার প্রতিরোধ নামীয় একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়।গোটা মার্চ মাস জুড়ে পলাশবাড়ী এলাকা ছিল উত্তাল। ঘাতক পাকবাহিনী সেদিন বীর সেনাসহ ৫ শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এদিন বৃহত্তর পাবনা জেলার ঐতিহ্যবাহী ‘নারিন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎসময়ের প্রধান শিক্ষক গর্বিত পিতা-মাতা আব্দুল আজিজ ও ফাতেমা বেগম দম্পতির বীর সন্তান লেফঃ রফিককে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। পার্শ্ববর্তী ভারতে শরনার্থী হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল ৩৫ হাজার নর-নারী। স্বাধীনতা বিরোধীরা তৎসময় ২ কোটির্ধ্ব টাকা মূল্যের বাড়ী-ঘর জ্বালিয়ে দেয়াসহ বিভিন্ন সম্পদ বিনষ্ট করেছিল। পাকবাহিনীর নানা শিঁহরিত ও লোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞ চালানোর এক পর্যায় পলাশবাড়ী এলাকা পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া সেদিনের দামাল ছেলেদের মমতাময়ী মা তাদের সন্তানদের ফিরে পাননি। জীবনভর অসহনীয় হতাশার জ্বালা বুকে নিয়ে এমন অনেক ‘মা’ গেছেন চিরতরে হারিয়ে।

স্বাধীনতা যুদ্ধে যাঁদের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে এদেশে স্বাধীনতার লাল-সবুজ আচ্ছাদিত পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল। উদিত হয়েছিল লাল টুকটুক সূর্য। হানাদার মুক্ত হয়েছিল স্বদেশ ভূমি। গভীর শ্রদ্ধা সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। বিজয়ের উল­াসে যুদ্ধে অংশ নেয়া বীর যোদ্ধাদের ‘জয় বাংলা-জয় বাংলা’ গগণ বিদারী শ্লোগানে গোটা পলাশবাড়ীর আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। আর এভাবেই সেদিন ৮ ডিসেম্বর পলাশবাড়ী এলাকা হানাদার মুক্ত হয়েছিল।
১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসটি পালনের মধ্যদিয়ে স্মরণীয়-বরণীয় করে রাখতে পলাশবাড়ী উপজেলা প্রশাসন, পৌর প্রশাসন ৪দিন ব্যাপি বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহন করেছেন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদ উপজেলা কমান্ড, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবি সংগঠন গুলো ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহ পৃথক ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের মধ্যদিয়ে দিবসটি পালন করবে বলে জানা গেছে।

Comments

comments