সর্বশেষ সংবাদ

সুন্দরগঞ্জের পিআইও নুরুন্নবীর নির্যাতনের শিকার এক উপ-প্রকৌশলী এখন মানুষিক রোগী 

জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা থেকে :
ঘুষ-দুর্নীতি, লুটপাট আর ক্ষমতার দাপটেই সীমাবদ্ধ নয়, গাইবান্ধার সেই বদলি হওয়া প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নুরুন্নবী সরকার। এবার পিআইও নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে অধিনস্ত মোস্তাকুর সরকার নামে এক উপ-সহকারী প্রকৌশলীর বেতন-ভাতা আটক রাখাসহ শারীরিক-মানষিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বর্তমানে মানুষিক ভারসাম্য হারিয়ে মোস্তাকুর সরকার ‘পাগল’ অবস্থায় নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। এদিকে, পিআইও নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে তদন্তে বেশ কিছু অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দ্রুতই ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস প্রাশাসনের।

জানা গেছে, মোস্তাকুর সরকার ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসে (পিআইও) SM0, DMRPA শীর্ষক প্রকল্পে উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। অফিসের দায়িত্ব পালন করাসহ পিআইও’র অধিনে ইজিপি প্রকল্পের লেবারদের অর্থ ছাড় ও বেতন-ভাতা বিল জমা দেন মোস্তাকুর সরকার। কিন্তু তাতে স্বাক্ষর না করে নানা তালবাহনা করেন পিআইও নুরুন্নবী সরকার। মুলত পিআইও নুরুন্নবীর দুর্নীতি-অনিয়মসহ বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা আদায়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মোস্তাকুর সরকারের বেতন-ভাতা আটকিয়ে রাখেন পিআইও নুরুন্নবী এমন অভিযোগ মোস্তাকুর সরকারের স্বজনদের।

মোস্তাকুরের বাবা পলাশবাড়ী উপজেলার ব্র্যাক মোড়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলীর অভিযোগ, ‘মোস্তাকুর এরআগে সাদুল্যাপুর ও সাঘাটা উপজেলায় সঠিকভাবেই দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় যোগদানের পর থেকে তার বিল-বেতন প্রদানে তালবহনা করেন পিআইও নুরুন্নবী। বিল-বেতন চাইলে তাকে প্রায়ই গালিগালাজসহ শারীরিক-মানষিক নির্যাতন করতেন পিআইও নুরুন্নবী। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ফেব্রুয়ারীতে তাকে মানুষিক রোগী উল্লেখসহ অফিস না করা এবং দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে মোস্তাকুর সরকারের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটি চিঠি দেন পিআইও নুরুন্নবী। সুস্থ্য ছেলেকে মানুষিক রোগী বলে চিঠি দেয়ার খবরে মোস্তাকুর ক্ষোভ-অপমান বোধ করেন। একদিকে বেতন-বিল না পাওয়া অন্যদিকে মানুষিক রোগী বলে মিথ্যা অপবাদ দেয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েন মোস্তাকুর। এক পর্যায়ে মানুষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে মোস্তাকুর সরকার। এখন অসুস্থ্য অবস্থায় বাড়িতেই মানবেতর জীবন-যাপন করছে মোস্তাকুর। দিনরাত সে এখন এলোমেলো কথাবার্তা বলে সেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াই। তাকে কিছু বললেই বলে, ‘আমি দুর্নীতি করিনা, আমার কোন দোষ নাই, আমাকে মারবেন না’। এছাড়া অপরিচিত মানুষ দেখলেই বলে আমাকে ধরবেন না, আমাকে মেরে ফেলবেন না’।

তিনি আরও বলেন, ‘পিআইও নুরুন্নবীর ঘুষ-বাণিজ্যে ও অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তার উপর অত্যাচার-নির্যাতন করা হতো। সুস্থ্য ও মেধাবী মোস্তাকুর সরকারকে নানা নির্যাতনে পাগল বানানো হয়েছে। যোগদানের পর থেকে প্রায় এক বছর তার বিল-ভাতা প্রদান করেনি পিআইও নুরুন্নবী সরকার। প্রায় ৩ বছর ধরে পলাশবাড়ীর নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন মোস্তাকুর। তাকে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেও কোন উন্নতি হয়নি। তার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা খরচ এখন অনেকটাই নি:স্ব। প্রতিকার দাবিতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে বারবার অবগত করেও কোন সুরহা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এমন অবস্থায় মোস্তাকুরকে নিয়ে বর্তমানে অনেকটাই বিপাকে তার পরিবার। তাই মোস্তাকুর সরকারের বকেয়া বেতন-বিল ও চাকুরীতে বহালসহ অভিযুক্ত পিআইও নুরুন্নবী সরকারের দৃষ্টান্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।

এদিকে, দুর্নীতি-লুটপাটের একাধিক প্রতিবেদন যমুনা টেলিভিশনে প্রচারের পর অভিযুক্ত পিআইও নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। এরেইমধ্যে সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন তদন্ত কমিটি। তদন্তে পিআইও নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে তদন্তে দাপট-দাম্ভিকতা, অসদচারণসহ বিভিন্ন হুমকির অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক আবদুল মতিন বলেন, পিআইও নুরুন্নবী সরকারের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের অবগত করেছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে। সমস্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শীঘ্রই পিআইও নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে’।

জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আলহাজ, ইদ্রিস আলী বলেন, ‘যোগদানের পর থেকে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠে নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের তদন্তে বেশ কিছু অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলাও করেছিলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ-প্রমাণ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অবগত। ইতোমধ্যে তাকে বদলির আদেশ দিয়েছে অধিদপ্তর’।

উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাকুর সরকারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অফিসে যোগদানের পর মোস্তাকুর অনিয়মিত অফিস করতেন। তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলাসহ নানা অভিযোগে পিআইও নুরুন্নবী পত্র মাধ্যমে অবগত করেছেন। পিআইও নুরুন্নবীর দেয়া পত্রে মোস্তাকুরকে মানুষিক রোগী অসুস্থ্য উল্লেখ করা হয়। তবে মোস্তাকিরের আবেদন পত্র পেয়ে যাচাই-বাছাই করে তার সম্পর্কে একটি পত্র সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পাঠানো হয়েছে। তার বেতন-ভাতা ও চাকুরীতে বহালের বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সিন্ধান্তের অপেক্ষায়।

পিআইও নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে নানা অত্যচার-জুলুলের অভিযোগ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও। তাই পিআইও নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও শাস্তি নিশ্চিতের দাবি-সংশ্লিষ্ট মহলের। বদলির আদেশের পর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ছুটি নিয়ে আর অফিসে আসছেন না পিআইও নুরুন্নবী সরকার। বারবার তাকে খুঁজেও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটি ও উপজেলা প্রশাসন। তবে বদলির আদেশে ঠেকাতেই নানা কৌশলে তৎপর পিআইও নুরুন্নবী। সর্বশেষ তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের চেয়ারম্যান বরাবরে অন্যত্র বদলির আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া সংবাদ প্রচারের পর থেকে পিআইও নুরুন্নবী বিভিন্ন কৌশলে যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান পলাশসহ স্থানীয় সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে চাঁদাবাজির মামলা করার পায়তারা করছেন।

Comments

comments