সর্বশেষ সংবাদ

ভারতের রায়গঞ্জে “গ্রন্থিকগণ কহে” নাটকের সফল মঞ্চায়ন করলো কাহালু থিয়েটার

গোবিখবর ডেস্ক: গত ২০ সেপ্টেম্বর বগুড়ার কাহালু থিয়েটারের ২৪ সদস্যের একটি দল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রায়গঞ্জের জাগরী থিয়েটার গ্রুপের আয়োজনে দুইদিনব্যাপী দুই বাংলার নাট্য মিলন উৎসবে যোগ দিতে বাংলাদেশ ছাড়ে। ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর মোট ১৩ টি দল নাটক মঞ্চায়ন করে যার মধ্যে একমাত্র বিদেশী দল ছিল কাহালু থিয়েটার। উৎসবের প্রথম দিনে সাতটি নাটক মঞ্চায়িত হয় যার সব শেষে ছিল কাহালু থিয়েটারের নাটক। আয়োজক সংস্থা জাগরী থিয়েটারের সভাপতি সান্ত রাহা জানান, বাংলাদেশের নাটকটি দেখার জন্য দর্শকরা উদগ্রীব হয়ে ছিল। সাড়ে আটশ সিটের মধ্যে সাতশ টি টিকেট আমরা বিক্রি করেছি বাকি দেড়শ রিজার্ভ ছিল।

শনিবার রাত সাড়ে আটটায় কাহালু থিয়েটার আচার্য ড. সেলিম আল দীন রচিত আব্দুল হান্নান নির্দেশিত “গ্রন্থিকগণ কহে” নাটকটি মঞ্চায়ন করে। উৎসবে নাটক উপভোগ শেষে প্রধান অতিথি রায়গঞ্জের বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত বলেন, বাংলাদেশ আমাদের কাছে অন্যরকম একটা আবেগের নাম। নান্দনিক পরিবেশনের মাধ্যমে এই আবেগকে আরো উস্কে দিয়েছে কাহালু থিয়েটারের গ্রন্থিকগণ কহে নাটকটি। যেন বিনি সুতোর মালায় গাঁথা আমাদের বাঙ্গালীর মেলবন্ধন। কলকাতা জাগৃতি থিয়েটারের সংগঠক শক্তি কুমার ঘোষ জানালেন, নাটকটি কখনও ঝুলে গেছে এমন মনে হয়নি। কেননা নাটকের অনবদ্য আবহ সঙ্গীত দর্শকদের সবসময় একটা ঢেউয়ের মধ্যে রেখেছে ঘোরের মধ্যে রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গের পাঠকপ্রিয় পত্রিকা উত্তরবঙ্গ সংবাদের সাংবাদিক সহঃ অধ্যাপক সুকুমার বাড়ই অনুভূতি জানাতে গিয়ে লিখেছেন, কলাকুশলীদের অভিনয় দক্ষতা প্রেক্ষাগৃহের সমস্ত দর্শকদের দিয়েছে নাটকীয় মুগ্ধতা। নাটকে যেমন পাওয়া গেছে গ্রামবাংলার যাত্রাপালার অনুভূতি তেমনি মিলেছে কনসার্টের মন ভুলানো বাজনা। ছিল ভাটিয়ালী গানের সাথে অন্যান্য লোকগানের অনবদ্য মেলবন্ধন। হাসিকান্নায় ভরপুর  এই নাটক দেখতে দেখতে অনেককেই চোখ মুছতে দেখা গেছে। আবার কখনও কখনও হাসতে হাসতে পাশের দর্শকের ঘাড়ে মাথা চলে গেছে বুঝতে পারেননি আরেক দর্শক।

নাটক শেষে কাহালু থিয়েটারের সকল সদস্যদের উত্তরীয় পড়িয়ে দেয় রায়গঞ্জবাসী। শুভেচ্ছা ক্রেস্ট এবং ভাস্কর্য স্মারক গ্রহণ করেন কাহালু থিয়েটারের সভাপতি আব্দুল হান্নান। এরপর দুইদেশের জাতীয় সংগীত গেয়ে প্রথমদিনের মিলনমেলার সমাপ্তি হয়। এরপরে উৎসবের দ্বিতীয় দিনে দর্শকসারিতে বসে অন্যান্য দলের নাটক উপভোগ করে কাহালু থিয়েটার। ঘুরে বেড়ায় কুলিক নদীর পাড়ে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম পাখির অভয়ারণ্যে। ২৪ সেপ্টেম্বর দলটি দেশে ফেরে। নাটকটি ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের আরেকটি দল মালদহ গাজোলের বিষাণ নাট্য সংস্থার নাট্য উৎসবে আগামী ২৪ ডিসেম্বর মঞ্চায়নের আমন্ত্রণ পেয়েছে।

নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাহাজাদ আলী  বাদশা, সিজুল ইসলাম, ফারহা রহমান স্মৃতি, মুনসুর রহমান তানসেন, সাইফুল ইসলাম, সঞ্চয়িতা সরকার বিথী, সায়ন্তিকা সরকার, ফরিদুর রহমান ফরিদ, গোলাম রব্বানী, আব্দুর রশিদ বুলু, আব্দুল হান্নান, আবু বক্কর সিদ্দিক, আব্দুল আজিজ, মুনসুর রহমান সরদার, ইউসূফ আলী, নয়ন কান্তি সরকার এবং খন্দকার শামসুল আকন্দ। আবহ সঙ্গীতে আছেন সুবাস চন্দ্র দাস মিঠু, সেকেন্দার আলী মুন্সী, আব্দুল আজিজ, সিদ্দিকুর রহমান। আলোক প্রক্ষেপণে সহযোগিতা করেছেন ভারতের শুভঙ্কর সাহা।

নাটকের গল্পে উঠে আসে মানিকগঞ্জের একটি যাত্রা দলের পেছনের নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকার গল্প। মড়ু ঘোষালের যাত্রা দলের নাম “দি নিউ ঘোষাল অপেরা”। সাত দিনের জন্য যাত্রা দলটির বায়না হয় কেরানীগঞ্জে। যাত্রাদলটি মহড়া শেষে কেরানীগঞ্জের পথে রওনা হয়। নায়ক শাকামালের প্রতি নায়িকা নিশির সবসময় দূর্বলতা থাকলেও সে কখনই তা মুখে প্রকাশ করেনা। এদিকে শাকামাল প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়ায় নিশির প্রতি নিজের দূর্বলতা কখনই প্রকাশ করেনা। কেরানীগঞ্জে যাত্রার আসর শুরুর আগে মেলা কমিটি ও স্থানীয় চেয়ারম্যানের শর্ত দেয় প্রিন্সেস নাচাতে হবে। দল টিকে রাখার তাগিদে চেয়ারম্যানের এ অন্যায় শর্ত মালিক মড়– ঘোষাল এবং কামাক্ষী মেনে নিলেও দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শাকামাল, নিশি, শঙ্কর, চম্পা সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে। তারা জানায় সুস্থ ধারার যাত্রাপালার বিপরীতে অশ্লীল কুরুচিপূর্ণ নাচের কারণে দর্শকরা খারাপ অভ্যাসের দিকে ধাবিত হচ্ছে যা একদিন যাত্রাশিল্প কালের বিবর্তনে ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু মড়– ঘোষাল স্থানীয়দের শর্তের কারণে পরিস্থিতির চাপে পড়ে প্রিন্সেসকে যাত্রাপালা শুরুর আগে নাচাতে বাধ্য হয় এবং তার যাত্রাদলের অভিনয়শিল্পীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় প্রিন্সেসের নাচ ভেদ করে “রাজকন্যা চম্পাবতী” পালা দাঁড় করিয়ে দর্শকদের মন জয় করতে। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় শাকামাল, নিশি, শঙ্কর এবং চম্পা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এবং তারা তাদের অভিনয় নৈপুণ্যতায় দর্শকদের প্রিন্সেসের নাচকে ভুলিয়ে পুরাণ কথার “রাজকন্যা চম্পাবতী” পালা দাঁড় করিয়ে বিমোহিত করে। এরপর হঠাৎ নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়। যাত্রাদলের হিরোইন নিশিকে নিজের বউ দাবি করে এলাকার গজেন্দ্র নামে এক দুশ্চিরিত্র মাতাল লোক। তখন শাকামাল নিশিকে একান্তে প্রশ্ন করে ঘটনা সত্য কিনা? সেই সাথে প্রথমবারের মত সে নিশিকে জানায়, সে নিশিকে ভালবাসে আর তাকে নিয়েই সংসার করতে চায়, একসাথে একটিং করতে চায় যাত্রা করতে চায়। প্রতি উত্তরে নিশি জানায়, একদিন যাত্রাদলে তার অভিনয় দেখেই গজেন্দ্র তাকে ঘরে তুলে নেয় কিন্তু বিয়ের পর তাকে যাত্রা করতে বাঁধা দেয় কেননা সমাজে থেকে যাত্রা করা যায় না এ হলো সমাজ বিরোধী কাজ। অবশেষে নিশি অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে গজেন্দ্রকে ডিভোর্স দিয়ে আবার ফিরে যায় যাত্রাদলে নিজের ভালবাসার মঞ্চে ভাললাগার আসরে। এমন বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে সে শাকামালের প্রস্তাবকে আগ্রাহ্য করে। এসময় গজেন্দ্র এলাকার চেয়ারম্যান ও গুন্ডাপান্ডা নিয়ে আসে নিশিকে ফেরত নেবার জন্য হট্টগোল শুরু করে তখন যাত্রাদলের সকল শিল্পী এমনকি ভিলেন কামাক্ষী এবং প্রিন্সেস দিলরুবাও রুখে দাঁড়ায়। এমন দোটানায় সবার অগোচরে নিশি বিষ খেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয় এবং অন্য ভুবনে যাত্রা শুরু করে।

নাটকটি প্রযোজনায় সহযোগিতা করছে কলেজ থিয়েটার, বগুড়া থিয়েটার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বগুড়া, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান এবং বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার।

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

Comments

comments