সর্বশেষ সংবাদ

পলাশবাড়ীর কালীবাড়ী হাটে চামড়ার বাজার মূল্যের চরম দরপতন

আরিফ উদ্দিন, স্টাফ রিপোর্টার, গাইবান্ধা থেকে: রপ্তানি বানিজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম পণ্য রপ্তানি বানিজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম পণ্য চামড়া। বিগত ৩১ বছরের মধ্যে ঘটেছে চামড়ার বাজার মূল্যের দরপতন। দেশের অন্যতম চামড়া কেনা-বেচার হাট গাইবান্ধার পলাশবাড়ী সদরের কালীবাড়ীহাট। চামড়ার হাটটি দীর্ঘ বছর ধরে সপ্তাহের প্রতি শনি ও বুধবার বসলেও পরবর্তিতে শুধু বুধবার করে বসে আসছে।
বিগত আড়াই যুগের মধ্যে কোরবানির পশুর চামড়ার এমন দরপতনের ঘটনা ঘটেনি। সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত হাট ঘুরে দেখা মেলে চামড়া কেনা-বেচার বিভিন্ন চিত্র।চামড়ার আমদানি এবং ক্রয়মূল্য দু’টোই ছিল কম। ক্রেতাদের চাহিদা ছিল মোটামুটি উল্লেখ করারমত। তবে আমদানিকৃত চামড়া অবিক্রিত অবস্থায় ফেরৎ যেতে দেখা যায়নি। এবার চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা হযবরল পরিস্থিতি। অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এবার স্মরণকালের রেকর্ডবিহীন চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রনহীন। অনেকেই জানান গ্রামাঞ্চলে সরাসরি কোরবানির মাঠে যেসব কোরবানিদাতা তাদের কোরবানির চামড়া বিভিন্ন মাদ্রাসা-মসজিদ-এ দান করেছিলেন সেইসব প্রতিষ্ঠান চামড়া ক্রেতা না পেয়ে অবিক্রিত থাকায় তা মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন বলে জানা যায়।

শুধু উত্তরাঞ্চল নয় রাজধানী ঢাকা থেকে ট্যানারি, আড়ৎদার, বিভিন্ন লেদার কোম্পানি, ছোট-বড় ক্রেতাসহ চামড়া শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত ক্রেতারা হাটটিতে আসেন।সারাবছরের ধারাবাহিকতায় বিশেষ করে বছরের দুই ঈদে হাটটি চামড়া বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের মিলন মেলার স্থান হিসেবে পরিণত হয়। এবারের কোরবানির ঈদ ঈদুল আযহা হয়েছে গত ১২ আগস্ট সোমবার। একদিন পর ১৪ আগস্ট বুধবার ছিল চামড়া হাটের নির্দিষ্ট দিন।

কিন্তু একদিনের ব্যবধানে কোরবানির মাঠ পর্যায় ফড়িয়া ক্রেতাদের ক্রয়কৃত চামড়া প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত করনের ফলে চামড়া আমদানি হয়নি। একারণে ক্রেতা-বিক্রেতা কারোরই হাটটিতে পদচারণা ঘটেনি। এবারে কোরবানির মাঠ পর্যায় চামড়ার মূল্য বলতে গেলে ছিল প্রায় মূল্যহীন।পলাশবাড়ী এলাকার কোরবানির মাঠে প্রতি পিস গরু ১০০ টাকা হতে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত ক্রয়-বিক্রয় চোখে পড়ে।

স্মরণকালের চামড়ার দরপতন নিয়ে সারাদেশ জুড়ে শুরু হয় চরম অস্থিরতা। স্থিতিশীল পরিস্থিতি রূপ নেয় অস্থিতিশীল রুপে। মূল্যের এমন দরপতনে মূলতঃ ঠকেছেন ফকির-মিসকিন অসহায় গরীব জনগোষ্ঠী। কারণ চামড়ার বিক্রিত অর্থ ছিল তাদেরই প্রাপ্য।
আটদিন পর ২১ আগস্ট বুধবার ছিল চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে সংশ্লিষ্টসহ সর্বস্তরের সচেতন মহলের দৃষ্টি ছিল এদিনটির দিকে। সবারই সংশয় ছিল ঈদ পরবর্তি প্রথম হাটের এদিনে চামড়ার আমদানি ঘটবে কি-না, ক্রেতা বা বিক্রেতাদের পদচারণা ঘটবে কি-না, দরদামই বা কেমন যাবে। সবমিলিয়ে চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে নানা সংশয়, আলোচনা-সমালোচনা ও পর্যালোচনা ছিল দৃশ্যমান। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এদিন বিপুল পরিমাণ কোরবানির পশু চামড়ার আমদানি ঘটে। ক্রেতাদেরও উপস্থিতিও ছিল উল্লেখ করারমত। এরআগে সোমবার বিকেল থেকে হাটটিতে চামড়া আমদানি শুরু হয়। সোমবার পেরিয়ে মঙ্গলবার দিন-রাত আমদানির পাশাপাশি বুধবার কাকডাকা ভোরে মূলতঃ আনুষ্ঠানিক কেনাবেচা পর্ব শুরু হয়। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে চামড়া ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত অসংখ্য ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগম ঘটে।

এসময় ঢাকা থেকে চামড়া কিনতে আসা আর. কে লেদার কোম্পানির পক্ষে চামড়া ক্রেতা ইকবাল হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি জানান প্রতিপিস ৩০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার গরুর চামড়া কিনেছেন।ঢাকা থেকে আসা চামড়া ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এসবিএস লেদার, এ্যাপেক্স, আকিজ কোম্পানির পক্ষে খরিদ্দার মাহবুব ও হাজী সাইফুল এবং পান্না লেদার ছাড়াও রংপুর, বগুড়া, নাটোর, টাঙ্গাইল, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের ছোট-বড় অনেক ক্রেতাই হাটে এসেছিলেন। তারা কমবেশি চামড়াও খরিদ করেছেন। রংপুরের মিঠাপুকুর থেকে আসা মৌসুমি চামড়া বিক্রেতা হায়দার আলী জানান ১০০ পিস চামড়া নিয়ে এসেছিলেন হাটে। ৮০০ টাকা করে বিক্রি করে তিনি মোটামুটি লাভবান হয়েছেন।

ক্রেতা-বিক্রেতাসহ ইজারাদার সূত্র জানান হাটে আনুমানিক ২০/২৫ হাজার গরু এবং ১০/১৫ হাজার ছাগলের চামড়ার আমদানি ঘটেছিল। আমদানিকৃত চামড়া সমুদয় বিক্রি হয়েছে বলে জানা যায়। দাম কম হলেও ক্রেতাদের চাহিদার তুলনায় আমদানি ছিল কম। এছাড়া অন্যান্য ক্রেতারাও তাদের সাধ্যমত চামড়া কিনেছেন। সবমিলিয়ে তিনি জানান ক্রেতাদের উপস্থিতিসহ কেনা-বেচা ছিল মোটামুটি সন্তোষজনক। হাটটির মূল ভৌগলিক সিমারেখার প্রতিটি কোনা চামড়ায়-চামড়ায় উঠে ভড়ে। আর প্রতি বছরের ন্যায় হাটের স্থান সংকুলান না হওয়ায় এদিন কাঁচাপন্নসহ নিয়মিত অন্যান্য পণ্যের ব্যবসায়িরা তাদের পণ্য সরিয়ে নেন। হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয়।

তবে মঙ্গলবার গভীররাত থেকেই ধপাস ধপাস শব্দে গরু-খাসি, বকরি-ভেঁড়া-মহিষের চামড়ার প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের সাথে কেনাবেচার পর্ব শুরু হয়। রাজধানী ঢাকা থেকে আসা ক্রেতারা বুধবার সকালের আগেই হাটের মূল কেন্দ্রে সমেবেত হতে থাকেন। বুধবার দিনভর পেরিয়ে রাতনাগাদ চলে চামড়া কেনা বেচা। বাজারমূল্যের চরম ধ্বস হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বুধবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে যাচাই-বাছাইসহ চামড়া কেনা-বেচা চলছিল।

Comments

comments