সর্বশেষ সংবাদ

নওগাঁয় ভেজাল গুড়ের কারখানা

ইখতিয়ার উদ্দীন আজাদ, নওগাঁ থেকে: নওগাঁয় প্রশাসনকে বৃদ্ধাআঙ্গুলি দেখিয়ে চিনির সঙ্গে ময়দা, ভুট্টার গুড়া, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকারি ও ক্ষতিকর রঙসহ নানা বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে উৎপাদন করা হচ্ছে নকল আখের গুড়। এক শ্রেণির অর্থলোভী গুড় উৎপাদনকারী আখের গুড়ের ব্যাপক চাহিদাকে পুঁজি করে প্রশাসনের নাকের ডগায় নকল গুড় তৈরি করে বাজারজাত করছেন। এসব গুড় স্থানীয় জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ট্রাক ভরে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু, নেই কোনো নজরদারি বা সক্রিয় পদক্ষেপ। এতে হুমকির মুখে পড়তে পারে জনস্বাস্থ্য বলে জানিয়েছেন সচেতন মহল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলার মহাদেবপুর উপজেলার সফাপুর ইউনিয়নের মোমিনপুর গ্রামের সোমসের আলীর ছেলে আবদুল আজিজ (৬০) নিজ বাড়িতে প্রায় ১৫ বছর থেকে অবাধে নকল গুড়ের কারখানা চালিয়ে আসছে। নকল গুড় তৈরি করতে কোন আখের প্রয়োজন হচ্ছে না। সারা বছর নিয়মিতভাবে তৈরি করা হচ্ছে নকল আখের গুড়। যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। এ কারখানা মালিক প্রতিদিন শত শত মণ নকল আখের গুড় তৈরি ও বাজারজাত করছেন। এ গুড় তৈরি করতে শুধু প্রয়োজন হচ্ছে চিনির সঙ্গে ময়দা, ভুট্টার গুড়া, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকারি ও ক্ষতিকর রঙসহ বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্য। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এ নকল গুড়ের কারখানা চলছে দেদারছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের রহস্যজনক নিরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহলের। তারা এ কারখানা বন্ধের জন্য প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত গুড় বাজারে আসলেও সংখ্যায় কম। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় নকল গুড়ের রঙ সাদা ও আকর্ষণীয় করা হচ্ছে। ফলে ক্রেতারা সাদরে তা গ্রহণ করছে। পক্ষান্তরে প্রকৃত গুড়গুলো দেখতে তুলনামূলক কালো হওয়ায় তা ক্রেতারা কিনছেন না। ফলে স্বাদ-গন্ধহীন সেই নকল গুড়েই সয়লাব হচ্ছে হাট-বাজার।
কৃষি তথ্য সার্ভিস এর ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, আখের দানাদার গুড় উৎপাদনের জন্য পরিপূর্ণ পরিপক্ব আখ প্রয়োজন। উপযোগী জাতগুলো হলো- ঈশ্বরদী ১৬, ঈশ্বরদী ২৬, ঈশ্বরদী ৩০, ঈশ্বরদী ৩৩, ঈশ্বরদী ৩৮। প্রচলিত আখ মাড়াইকলের রস আহরণ ক্ষমতা ৪৫ থেকে ৫০ ভাগ। বাংলাদেশে ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত উন্নত আখ মাড়াইকলের রস আহরণ ক্ষমতা প্রায় ৬০ ভাগ।
ওই ওয়েবসাইট সূত্রে আরো জানা যায়, বিভিন্ন কারণে গুড় পরিশোধন করা কঠিন। কারণগুলো হলো- রোগ ও পোকা আক্রান্ত আখ, অপরিপক্ব বা অধিক পরিপক্ব আখ, রসে অধিকমাত্রায় গ্লুকোজ ও ফরুকটোজ, আখের জাত ও রস জ্বাল দেওয়ার ভুল পদ্ধতি ইত্যাদি। এসব কারণে উন্নতমানের দানাদার গুড় উৎপাদন সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় গুড় প্রস্তুত কারকরা গুড়ের রঙ দ্রুত পরিবর্তনের জন্য অতিমাত্রায় রাসায়নিক পরিশোধক দ্রব্য হাইড্রোজ ব্যবহার করা হচ্ছে। যা মানবদেহের স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। হাইড্রোজ দেওয়া গুড়ে হাইড্রোজের গন্ধ থাকে এবং রঙ হালকা সাদাটে বা অনুজ্জ্বল সোনালি হয় সাধারণত ভাবে।

মোমিনপুর গ্রামের বাসিন্দা খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আখ ছাড়াই চিনি ও বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে আবদুল আজিজ নকল আখের গুড় তৈরি করছেন। এসব নকল গুড় স্থানীয় ব্যবসায়ী ছাড়াও বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে গিয়ে বাজারজাত করছে। কিন্তু, প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

পতœীতলা উপজেলার নজিপুর মায়ের দোয়া কবিরাজ ঘর এর পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগে জানান, কবিরাজী কাজে বিভিন্ন ঔষধ প্রস্তুত কাজে খাঁটি গুড় প্রয়োজন হয়। কিন্তু, সম্প্রতি নজিপুর নতুন হাট হতে গুড় কিনে এতে ভেজালের পরিমাণ মিশ্রণ থাকায় ঔষধ তৈরিতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি।
পতœীতলা উপজেলার নজিপুর পৌর এলাকার আলহেরা পাড়ার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, পান্তা ও মুড়িতে গুড় খাই ছোট বেলা হতেই। আবার আমের আচার তৈরিতেও গুড় লাগে। কিন্তু, এ মৌসুমে গুড়ে অতিরিক্ত ভেজালের পরিমাণ থাকায় শারীরিক ভাবে স্বাস্থ্যহানি ও পেটের নানা রকম সমস্যায় পড়েছি।

মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আখতারুজ্জামান আলাল বলেন, ‘ক্ষতিকারক উপকরণ দিয়ে তৈরি নকল গুড় মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব গুড় খাওয়ার ফলে মরণব্যাধি ক্যান্সার, কিডনি ড্যামেজ, লিভারে পচনসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভানা থাকে।’
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নওগাঁ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস বলেন, ‘নকল গুড় উৎপাদন ও বাজারজাতকারীদের আইনের আওতায় আনা হোক।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর নওগাঁর (ভারপ্রাপ্ত) সহকারী পরিচালক মো: হাসান আল-মারুফ বলেন, দ্রুত তদন্ত পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
মহাদেবপুরের সফাপুর ইউপি চেয়ারম্যান সামসুল আলম বাচ্চু জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আমি খোঁজ নিচ্ছি।
মহাদেবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাজ্জাত হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি জরুরী ভিত্তিতে খোঁজ নিচ্ছি।’
মহাদেবপুর উপজেলা (ভারপ্রাপ্ত) নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা খাতুন বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই। যদি বিষয়টি সত্য হয়ে থাকে তাহলে কারখানা বন্ধসহ নকল গুড় উৎপাদনকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Comments

comments